বিশ্বকাপের বাকি দেশগুলো যখন একে একে তাদের চূড়ান্ত দল ঘোষণা করছে, সেখানে কিছুটা বাড়তি সময় নিচ্ছেন আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি। হুটহাট দল ঘোষণা না করে বিশ্বকাপের ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের কোচ বিশেষ কয়েকজন খেলোয়াড়ের ওপর গভীরভাবে নজর রাখছেন। কারণ, দলের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলার এখনও চোটের (ইনজুরি) সঙ্গে লড়াই করছেন, আবার বেশ কয়েকজন তরুণ তুর্কি নিজেদের ক্লাবের হয়ে মাঠ মাতাচ্ছেন এবং দুর্দান্ত পারফর্ম করে দলে সুযোগ পাওয়ার জন্য কোচের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করছেন। তাতে অম্ল-মধূর এক সমস্যাতে পড়তে হচ্ছে লিওনলে মেসি-আলভারেজদের কোচকে।
বিশ্বকাপের ট্রফি ধরে রাখার মিশনে তাড়াহুড়োর কোনো সুযোগই দিতে চান না স্কালোনি। আসলে আলবিসেলেস্তা কোচ ভালো করেই জানেন, দল চূড়ান্ত করার জন্য আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত যথেষ্ট সময় তাদের হাতে আছে। আর তাই প্রতিটি দিনকেই তাঁরা কাজে লাগাচ্ছেন পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের পেছনে। বিশেষ করে চোট কিংবা ফর্ম নিয়ে দোটানায় থাকা নির্দিষ্ট কিছু খেলোয়াড়ের অবস্থা একদম শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দেখে নিতে চান তাঁরা। মূলত সেরা ও সবচেয়ে নিখুঁত স্কোয়াডটিই বেছে নিতে চাইছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
স্কালোনির মাথায় এখন সবচেয়ে বড় যে দুশ্চিন্তা ভর করেছে এবং দল ঘোষণায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় নিতে বাধ্য করছে, তা হলো—খেলোয়াড়দের চোট। ইতিমধ্যেই তিনি এই কঠিন বাস্তবতা মেনে নিয়েছেন যে, দলের বেশ কয়েকজন মূল খেলোয়াড় শারীরিক সক্ষমতার একদম শেষ সীমায় পৌঁছেই বিশ্বকাপে যোগ দেবেন; এমনকি তাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে ম্যাচগুলোতে খুব দেখেশুনে ও বাড়তি সতর্কতায় খেলাতে হবে। ইউরোপিয়ান ফুটবল মৌসুমের হাড়ভাঙা খাটুনি আর ঠাসা সূচির ধকল যে স্কোয়াডের ওপর ভালোভাবেই পড়েছে, তা এখন একদম স্পষ্ট।
বিশ্বমঞ্চে নামার আগে আর্জেন্টাইন কোচিং স্টাফদের কপালে সবচেয়ে বড় ভাঁজ ফেলছে ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর চোট। ডান হাঁটুর ল্যাটারাল লিগামেন্টের চোট কাটিয়ে মাঠে ফিরতে এখন সময়ের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন এই ডিফেন্ডার। গত এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে টটেনহ্যামের হয়ে খেলার সময় নিজের গোলকিপার আন্তোনিন কিনস্কির সঙ্গে এক আকস্মিক ধাক্কায় এই চোটে পড়েন তিনি। রোমেরোর পুনর্বাসন প্রক্রিয়া বা রিহ্যাব নিজে দাঁড়িয়ে তদারকি করতে জাতীয় দলের ফিজিওথেরাপিস্ট লুইস গার্সিয়া স্বয়ং উড়ে গিয়েছিলেন লন্ডনে, তাঁর বাসায়। বর্তমানে এই ডিফেন্ডার আছেন কর্দোবায়, যেখান থেকে তাঁর শারীরিক অবস্থার ওপর কড়া নজর রাখা হচ্ছে।
চোটের তালিকায় নতুন সংযোজন নাহুয়েল মলিনা। আতলেতিকো মাদ্রিদের হয়ে মৌসুমের একেবারে শেষভাগে এসে গ্রেড-১ হ্যামস্ট্রিং ইনজুরিতে পড়েন এই রাইট-ব্যাক। তবে আতলেতিকোর হয়েই চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালে আর্সেনালের বিপক্ষে ম্যাচে সবচেয়ে বড় ভয়টা ধরিয়ে দিয়েছিলেন হুলিয়ান আলভারেজ। সেই ম্যাচে তাঁর বাঁ পায়ের গোড়ালি মচকে যাওয়ার পর দিয়েগো সিমেওনে থেকে শুরু করে আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি—উভয়েরই যেন বুক কেঁপে উঠেছিল, থমকে গিয়েছিল হৃৎস্পন্দন। আলভারেস অবশ্য এখন চোট কাটিয়ে পুরোপুরি সুস্থ।
গত রোববার রিভার প্লেটের হয়ে খেলার সময় গঞ্জালো মনতিয়েলের বাঁ পায়ের কোয়াড্রিসেপস পেশি ছিঁড়ে যাওয়ার খবরটি নিশ্চিত হয়। সেই ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই চলতি সপ্তাহে জাতীয় দলের জন্য এসেছে আরও দুটি খারাপ খবর। হেল্লাস ভেরোনার বিপক্ষে ম্যাচের পর থেকেই কোমোতে থাকা নিকো পাজ হাঁটুর ব্যথায় ভুগছেন।
সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে গোলপোস্টের নিচে আর্জেন্টিনার অতন্দ্র প্রহরী এমিলিয়ানো মার্তিনেসকে নিয়ে। অ্যাস্টন ভিলার হয়ে ইউরোপা লিগের ফাইনাল খেলতে নামার আগেই ডান হাতের অনামিকায় (রিং ফিঙ্গার) চোট পান ‘দিবু’ । অবশ্য এই চোট নিয়েই তিনি ফাইনালে খেলেন এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর দল ইউরোপা লিগের শিরোপাও ঘরে তোলে। তবে শিরোপার আনন্দ ছাপিয়ে বিশ্বকাপের আগে দিবুর এই চোট এখন কপালে চিন্তার ভাঁজ বাড়াচ্ছে স্কালোনির।
স্কালোনির খাতার পুরোটাই অবশ্য শুধু চোটের দুশ্চিন্তায় ভরা নয়। দলের কোচিং স্টাফরা একই সঙ্গে এমন কিছু খেলোয়াড়ের ওপর কড়া নজর রাখছেন, যারা প্রতিনিয়ত নিজেদের পারফরম্যান্সের গ্রাফ ওপরের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন এবং মধুর এক সমস্যায় ফেলছেন কোচকে। মাঠের পারফরম্যান্স দিয়ে এরা মূলত দলে ঢোকার জন্য ভেতর থেকেই এক তীব্র চাপ তৈরি করছেন।
এই মুহূর্তে এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ এমিলিয়ানো বুয়েন্দিয়া; অ্যাস্টন ভিলার হয়ে সদ্যই ইউরোপা লিগের শিরোপা জিতলেন এবং পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই ছিলেন দলের সফলতার অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি। তুরস্কের মাটিতে শিরোপা উদযাপনের ঠিক আগমুহূর্তে যখন বুয়েন্দিয়াকে বিশ্বকাপে সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে জিজ্ঞেস করা হয়, তিনি রহস্যের সুরে ছোট করে শুধু এটুকুই বলেন, ‘জাতীয় দল? দেখা যাক কী হয়...’।