নিজস্ব প্রতিবেদক:
" মানুষ গড়ার কারিগর যদি অমানুষ হয়" তাহলে সুশিক্ষা বহুদূর! কক্সবাজার শহরের ২ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত বিমানবন্দর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে নারী শিক্ষক ও ছাত্রীদের শ্লীলতাহানি, ইভটিজিংসহ নানান অনৈতিক আচরণের অভিযোগ উঠেছে। ইতোমধ্যে এসব অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিদ্যালয়ের শিক্ষক, ছাত্র- ছাত্রী, অভিভাবক সহ স্থানীয় সচেতন মহলের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে অভিযুক্ত শিক্ষক রেজাউলের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার প্রথম ধাপ হিসেবে তাকে উক্ত বিদ্যালয় থেকে প্রত্যাহার করে কক্সবাজার পরীক্ষণ বিদ্যালয়ে ডেপুটেশনে পাঠানো হয়েছে।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে সহকারী শিক্ষক রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে নারী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রতি অসৌজন্যমূলক ও আপত্তিকর আচরণের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, একাধিকবার সতর্ক করা হলেও শিক্ষক নামধারী রেজাউলের আচরণে কোনো পরিবর্তন আসেনি।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহানাজ ইয়াসমিন বলেন, নারী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৯ জানুয়ারি স্টাফ কাউন্সিলের সভায় রেজাউল করিমকে সতর্ক করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে পুনরায় অভিযোগ ওঠায় গত ২০ মে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়।
তিনি বলেন, “অভিযোগ রয়েছে যে, কোনো নারী শিক্ষক ওয়াশরুমে গেলে কিংবা নামাজের জন্য পোশাক পরিবর্তনের সময় রেজাউল সেখানে উঁকি দেওয়ার চেষ্টা করতেন। এছাড়া নারী শিক্ষকরা ছাদে গেলে তাদের অনুসরণ করার অভিযোগও রয়েছে। এসব ঘটনায় শিক্ষকদের মধ্যে অস্বস্তি ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
প্রধান শিক্ষক আরও বলেন, বিদ্যালয়ের সুষ্ঠু পরিবেশ ও পাঠদান কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
অভিযোগকারী নারী শিক্ষকদের মধ্যে আনজুমন আরা বেগম, খুরশিদা আক্তার, আনোয়ারা বেগম, সেতারা বেগম, মনোয়ারা বেগম, ছেলামে ও সংগীতা দাশ জানান, তারা দীর্ঘদিন ধরে অভিযুক্ত শিক্ষকের আচরণে মানসিকভাবে বিব্রত ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
তাদের ভাষ্য, “বারবার সতর্ক করার পরও তার আচরণে কোনো পরিবর্তন আসেনি। চতুর্থ, পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া শিশু শিক্ষার্থীদের সাথেও তার আচরণ নিয়ে অভিভাবকদের অভিযোগ রয়েছে। আমরা প্রথমে প্রধান শিক্ষকের কাছে এবং পরে শিক্ষা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। এখন প্রশাসন কী ব্যবস্থা নেয়, সেটাই দেখার বিষয়।
তারা আরও দাবি করেন, অতীতেও অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে নারী শিক্ষকদের শ্লীলতাহানি, কক্সবাজার পরীক্ষণ বিদ্যালয়ে ভর্তি বাণিজ্য সহ বিভিন্ন অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছিল। সে সময় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসাবে তাকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছিল। তবে কার্যকর শাস্তি না হওয়ায় তিনি একই ধরনের আচরণ অব্যাহত রেখেছেন বলে অভিযোগ করেন তারা।
এদিকে কয়েকজন অভিভাবক অভিযোগ করে বলেন, তাদের সন্তানরা প্রায়ই রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করলেও শুরুতে তারা বিষয়গুলো গুরুত্ব দেননি। পরে বিদ্যালয়ে এসে নারী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে একই ধরনের অভিযোগ শুনে তারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
অভিভাবকদের দাবি, অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষ প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
এদিকে একটি সূত্র জানায়, শিক্ষক নামধারী ভারুয়াখালীর করিম সিকদার পাড়ার মৃত ফরিদুল আলমের পুত্র রেজাউল ছিল একসময় বর্তমানে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের পদধারী নেতা। বিগত আওয়ামী লীগের পুরো সময় দলীয় প্রভাব বিস্তার করে কক্সবাজার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস ও সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস একটি চিহ্নিত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতো এই রেজাউল। দীর্ঘ এক যুগ ধরে সহকারী শিক্ষক রেজাউলের দেন- দরবারেই কক্সবাজারের প্রাথমিক শিক্ষকদের বদলী নিয়ন্ত্রিত হতো। ধরাকে সরাজ্ঞান করা এই ধুরুন্ধর রেজাউলের ইচ্ছাতেই জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ও সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার চলতো। বিগত আওয়ামী লীগের সময়ে শিক্ষক নামধারী রেজাউল শিক্ষক বদলী ও কক্সবাজার পরীক্ষণ বিদ্যালয়ে অনৈতিক ভাবে ভর্তি বাণিজ্য করে লাখ লাখ টাকা আয় করেছে।
সূত্র জানায়, জুলাই - আগস্ট বিপ্লবের পর রেজাউলের নেতাগিরি কিছুটা ভাটা পড়লেও হাল ছাড়েনি। জেলা ও সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে নতুন অফিসার আসা মাত্র রেজাউল অনৈতিক পন্থায় ম্যানেজ করে নতুন করে হারানো সাম্রাজ্য ফিরে পাওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাহীন মিয়া বলেন, “শিক্ষক রেজাউলের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে প্রাথমিক শাস্তি হিসেবে তাকে একটি স্কুলে সংযুক্ত করেছি। আমি আগে তার বিরুদ্ধে এতকিছু জানতাম না, এখন সজাগ হবো।
অন্যদিকে উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোক্তার আহমদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “অভিযোগের বিষয়ে আমি অবগত নই। অভিযোগ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে দেওয়া হয়েছে। তারা বিষয়টি দেখছেন।
শিক্ষক রেজাউল করিম সাথে কথা হলে তিনি জানান আমার বিরুদ্ধে যত অভিযোগ আসছে সব মিথ্যা, তদন্ত কমিটি যদি আমার বিরুদ্ধে কোন সত্যতা পায় তাহলে সেটা ব্যবস্থা নিবে সেটাই মেনে নিব।
এ ঘটনায় স্কুলের শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয়দের একটাই দাবি সাবেক ছাত্রলীগ ক্যাডার, চরিত্রহীন এই শিক্ষককে শুধু অন্য স্কুলে সংযুক্তি দিলে হবেনা, তাকে চাকুরী থেকে স্থায়ী বহিস্কার করতে হবে। এছাড়া বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।###