যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে হামলা চালায়, তবে লোহিত সাগরের তেল পরিবহনের পথ বন্ধ করে দেওয়ার জন্য ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের প্রস্তুত থাকতে বলেছে ইরান। বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে তিনটি বিশ্বস্ত সূত্র এই তথ্য জানিয়েছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে একটি নতুন এবং বড় ধরনের হুমকি সৃষ্টি করেছে।
ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং ইরানের হুথি মিত্রদের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুজন জ্যেষ্ঠ ইরানি সূত্র এবং বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আঞ্চলিক একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। তবে এই বার্তা কীভাবে পাঠানো হয়েছে বা মঙ্গলবার ইরানি বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে হামলার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকির পর এটি করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে সূত্রগুলো বিস্তারিত কিছু জানায়নি। এ বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং হুথি গোষ্ঠীর কোনও মুখপাত্র তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেননি।
হুথিদের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, ইয়েমেনের হুদাইদাহ ও এডেন উপসাগর সংলগ্ন পাহাড়ি অঞ্চলে বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মোতায়েন করে জাহাজ চলাচলে হামলার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে হুথিরা। এখন তারা কেবল চূড়ান্ত নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছে। লোহিত সাগর এবং এর প্রবেশদ্বার বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে যেকোনও ধরনের হুমকি ইরান কর্তৃক হরমুজ প্রণালি বন্ধের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটকে আরও মারাত্মক করে তুলবে এবং নতুন দফার যুদ্ধের বিস্ফোরক ঝুঁকিকে সামনে নিয়ে আসবে।
বর্তমানে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় লোহিত সাগরের জাহাজ বা বন্দরগুলোতে হুথিদের যেকোনও হামলা মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান দুটি তেল রপ্তানি পথকে একসাথে অবরুদ্ধ করে দেবে। এটি জ্বালানি সংকট এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের বিস্তৃত দ্বন্দ্বে এক নতুন ফ্রন্ট উন্মুক্ত করবে। হুথিদের ঘনিষ্ঠ সূত্রটি জানিয়েছে, ইয়েমেনে অবস্থানরত ইরানের ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর প্রতিনিধিরাই মূলত বাব আল-মান্দেব প্রণালি কখন বন্ধ করা হবে সেই সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করবেন।আঞ্চলিক উত্তেজনার অংশ হিসেবে সোমবার হুথিরা তাদের নিয়ন্ত্রিত একটি বিমানবন্দরে বোমা হামলার অভিযোগ এনে সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে, যা দুই পক্ষের মধ্যে চার বছরের যুদ্ধবিরতির অবসান ঘটায়। ঝুঁকি বিষয়ক গোয়েন্দা সংস্থা ভেরিস্ক ম্যাপলক্রফট-এর প্রধান মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক টরবজর্ন সোলভেদ্ট বলেন, হুথি ও সৌদির এই উত্তেজনা অত্যন্ত ভুল সময়ে এসেছে। যদি লড়াই তীব্র হয় এবং লোহিত সাগরের রফতানি অবকাঠামো ও জাহাজ চলাচলে ছড়িয়ে পড়ে, তবে এটি এ অঞ্চলের তেল রফতানির একমাত্র প্রধান বিকল্প পথকে হুমকির মুখে ফেলবে।
রিয়াদের ঘনিষ্ঠ দুটি আঞ্চলিক সূত্র জানিয়েছে, সৌদি আরব ইরান ও হুথিদের এই হুমকিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। রিয়াদ জানে যে ইয়েমেনি এই গোষ্ঠীটি এখন লোহিত সাগর নিয়ে ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় করছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানের ওপর হামলা চালানোর পর এই সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে। এর জবাবে তেহরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়, যা যুদ্ধের আগে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বহন করত। গত জুনে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে হওয়া একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে উত্তেজনা আরও বেড়েছে, যা একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের আশঙ্কা জাগিয়ে তোলার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির জ্বালানি প্রবাহ ব্যাহত করেছে।হরমুজ বন্ধ হওয়ার পর থেকে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের বিপুল পরিমাণ তেল সৌদি পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এই জলপথটি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ৭ শতাংশ বহন করে। গাজা যুদ্ধের সময় হুথিরা জাহাজে হামলা চালালে বড় বড় শিপিং কোম্পানিগুলো আফ্রিকার দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল পথ ব্যবহার শুরু করেছিল। এখন সৌদি আরব নিজেই তার জ্বালানি রফতানির ৭০ শতাংশ লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের মাধ্যমে পরিচালনা করছে। ফলে সেখানে সরাসরি কোনও হামলা তেল বাজারের জন্য বিশাল সমস্যা তৈরি করবে।
একটি আঞ্চলিক সূত্র জানায়, ইরানের ধর্মীয় শাসকরা লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল এবং এই পথে সৌদির তেল রফতানিকে হুমকির মুখে ফেলে বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য খরচ বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইছেন। সূত্রটির মতে, এই প্রণালি বন্ধ করা মোটেও কঠিন হবে না। যেকোনও সাধারণ রাইফেলধারী ব্যক্তিও জাহাজ চলাচলে বাধা দিতে পারে, এর জন্য অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রের প্রয়োজন পড়ে না।ইরান হুথিদের তাদের আঞ্চলিক প্রতিরোধ অক্ষ-এর অংশ মনে করে। এই জোটে লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইরাকের শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও রয়েছে, যারা ইতোমধ্যে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার আঞ্চলিক সংঘাতে যোগ দিয়েছে। তবে হুথি বিদ্রোহীরা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে এই লড়াইয়ে সরাসরি প্রবেশ করেনি। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরান হুথিদের অস্ত্র, অর্থ ও প্রশিক্ষণ দিচ্ছে এবং হিজবুল্লাহর মাধ্যমে এই সহায়তা পাঠানো হচ্ছে। তবে তেহরান বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।