প্রিন্ট এর তারিখঃ সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬ || প্রকাশের তারিখঃ সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬
মহেশখালীর গোলবারের অতন্দ্র প্রহরী সাঈদীকে কুপিয়ে জখম
গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে যে হাত দিয়ে একের পর এক শট ঠেকিয়ে,পা দিয়ে বল শট দিয়ে প্রতিপক্ষকে থামিয়ে দিতেন, আজ সেই হাতদুটি ও পা'সহ পুরো শরীর রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত। অপরাধ আর মাদকের বিষাক্ত ছােবল থেকে নিজের গ্রামকে রক্ষা করার কারণে দিনদুপুরে সড়কে ফেলে কোপানো হলো কক্সবাজার জেলা ফুটবল দলের উদীয়মান গোলরক্ষক সজিবুল ইসলাম সাঈদীকে (২৪)।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) দুপুর দেড়টার দিকে মহেশখালী উপজেলার হোয়ানক ইউনিয়নের কালালিয়া কাটা প্রধান সড়কে ঘটে যাওয়া এই ঘটনার পেছনে স্থানীয় জনপ্রতিনিধির পরিবারের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীর পারিবারিক সূত্র জানায়, স্বজনের বিয়ের দাওয়াত শেষে বাড়ি ফিরছিলেন সাঈদী। পথিমধ্যে হোয়ানক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মীর কাশেম চৌধুরীর বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছামাত্রই সাঈদীর মোটরসাইকেলের গতিরোধ করে ৩-৪টি মোটরসাইকেলের একটি দল।
সাঈদীর বড় ভাই মোরশেদ খান জানান, ইউপি চেয়ারম্যানের ভাই ভুট্টোর ছেলে নেহালের নেতৃত্বে সাঈদীকে গাড়ি থেকে টেনে-হেঁচড়ে নামিয়ে রামদা দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে দুর্বৃত্তরা। মোরশেদ খানের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ "কিছু দূরে দাঁড়িয়ে হামলার নির্দেশনা দিচ্ছিলেন চেয়ারম্যান মীর কাশেমের ছেলে মিরাজ। তার নির্দেশেই সাঈদীকে হত্যার উদ্দেশ্যে কুপিয়ে ফেলা রাখা হয়।"
মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে সাঈদীকে প্রথমে মহেশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরবর্তীতে স্থানান্তরিত করা হয় কক্সবাজার সদর হাসপাতালে। শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটলে শুক্রবার বিকেলেই তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ট্রমা সেন্টারে পাঠানো হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও গভীর ক্ষতের কারণে তার অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক।
খেলোয়াড় থেকে 'প্রতিবাদী যুবক সাঈদী': হামলার নেপথ্যে কী?
কেবল মাঠের খেলাতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না সাঈদী; নিজ এলাকা হোয়ানককে মাদকমুক্ত করতে তরুণদের সংগঠিত করে গড়ে তুলেছিলেন এক প্রতিরোধ আন্দোলন।২০২৪ সালের আগস্টে হোয়ানকের মোহরাকাটা বাজারে সাঈদীর উদ্যোগে আয়োজিত বিশাল মাদকবিরোধী মানববন্ধনে শত শত তরুণ অংশ নেন। স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশকে সাথে নিয়ে সাঈদী ও তার দলের তরুণরা একাধিকবার জুয়ার বোর্ড ও মাদকের আস্তানা গুঁড়িয়ে দেন। হামলার আগের রাতেও হোয়ানকের একটি সংগুপ্ত মাদক ও জুয়ার আখড়ায় স্থানীয় তরুণদের নিয়ে হানা দেন সাঈদী। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে রাতেই চেয়ারম্যানের ভাইপো নেহালের সাথে তার চরম বাকবিতণ্ডা হয় এবং পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সাঈদীকে সরাতে এই পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়।
ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত নেহাল ও মিরাজের মুঠোফোন বন্ধ রয়েছে। তবে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে টিটিএনকে ইউপি চেয়ারম্যান মীর কাশেম চৌধুরী মুঠোফোনে জানান:
"বৃহস্পতিবার রাতে আমার ভাইপো নেহালের সাথে সাঈদীর তর্কাতর্কি হয়েছিল। শুক্রবার দুপুরে নেহাল ও তার সঙ্গীরা সাঈদীর ওপর হামলা করেছে বলে শুনেছি। তবে আমার ছেলে মিরাজ সেখানে ছিল না।"
তবে মাদকবিরোধী মানববন্ধনে চেয়ারম্যান নিজে উপস্থিত ছিলেন কিনা বা সাঈদীর প্রতিবাদী ভূমিকার কথা জানতে চাইলে চেয়ারম্যান স্মারকভ্রষ্টতার অজুহাতে বিষয় এড়িয়ে যান।
একজন সম্ভাবনাময় জেলা গোলরক্ষকের ওপর এলাকার মাদক সিন্ডিকেটের এমন বর্বর হামলায় ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে পুরো কক্সবাজারের ক্রীড়াঙ্গন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বইছে ধিক্কারের ঝড়।
কক্সবাজারের ক্রীড়া সংগঠক ও স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের একটাই দাবি জনপ্রতিনিধির ক্ষমতার দাপট ভেঙে অবিলম্বে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করতে হবে এবং এই সামাজিক আন্দোলনকে বাঁচিয়ে রাখতে দ্রুত আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত