ইয়ানশান ইউনিভার্সিটি, চীন —
ঐন্দ্রিলার কাছে ইয়ানশান ইউনিভার্সিটিতে কাটানো গত এক বছর শুধু মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জনের পথচলা নয়। কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে অধ্যয়নরত একজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী হিসেবে চীনে তাঁর প্রথম বছরটি হয়ে উঠেছে একাডেমিক উন্নতি, সাংস্কৃতিক আবিষ্কার, ব্যক্তিগত বিকাশ এবং নতুন স্বপ্নের এক অনন্য যাত্রা।
এক বছর আগে ইয়ানশান ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্সের পড়াশোনা শুরু করার পর থেকেই অয়ন্দ্রিলা একটি আন্তর্জাতিক একাডেমিক পরিবেশের বিভিন্ন সুযোগকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে আসছেন। এই অভিজ্ঞতা তাঁকে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি সম্পর্কে নিজের জ্ঞান আরও বিস্তৃত করার পাশাপাশি গবেষণা ও আধুনিক প্রযুক্তির প্রতি আরও গভীর আগ্রহ তৈরি করতে সাহায্য করেছে।
তাঁর একাডেমিক যাত্রার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলো Presidential Scholarship লাভ করা। এই স্কলারশিপ তাঁর একাডেমিক প্রচেষ্টার স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি পড়াশোনা ও গবেষণায় আরও ভালো করার জন্য তাঁর আগ্রহ ও আত্মবিশ্বাসকে শক্তিশালী করেছে।
ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে অয়ন্দ্রিলা তাঁর একাডেমিক লক্ষ্যও নির্ধারণ করেছেন। তিনি Artificial Intelligence, Machine Learning এবং Data Science-এর মতো ক্ষেত্রে নিজের দক্ষতা আরও উন্নত করতে চান। পাশাপাশি গবেষণার দক্ষতা বৃদ্ধি, অর্থবহ একাডেমিক কাজে অবদান রাখা এবং গবেষণাপত্র প্রকাশের মাধ্যমে নিজের গবেষণার ক্ষেত্রকে আরও সমৃদ্ধ করার লক্ষ্য রয়েছে তাঁর। ভবিষ্যতে গবেষণা ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে একটি সফল ক্যারিয়ার গড়ে তোলাও তাঁর অন্যতম স্বপ্ন।
তবে একাডেমিক শিক্ষার বাইরেও চীনে তাঁর সময় কাটানোর অন্যতম আকর্ষণ হলো চীনা সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়া। নিজের সংস্কৃতির তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি সংস্কৃতিকে কাছ থেকে জানার সুযোগকে তিনি অত্যন্ত মূল্যবান মনে করেন। চীনের সমৃদ্ধ ইতিহাস, ঐতিহ্য, উৎসব, খাবার এবং জীবনযাপন তাঁকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছে। বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে মেলামেশা ও বন্ধুত্ব তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও বিস্তৃত করেছে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের গুরুত্বকে আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে সাহায্য করেছে।
বাংলাদেশ থেকে অনেক দূরে বসবাসের কারণে কিছু চ্যালেঞ্জও এসেছে। পরিবার, পরিচিত পরিবেশ এবং নিজের দেশকে অনেক সময় মিস করেছেন তিনি। তবে এসব অভিজ্ঞতাই তাঁকে আরও স্বাধীন, আত্মবিশ্বাসী, মানিয়ে নিতে সক্ষম এবং দায়িত্বশীল করে তুলেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক জীবন থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং প্রতিদিনের ছোট ছোট অভিজ্ঞতা—প্রতিটি মুহূর্তই তাঁর ব্যক্তিগত বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
একজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী হিসেবে অয়ন্দ্রিলার স্বপ্ন শুধু নিজের সাফল্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি চান তাঁর এই যাত্রা বাংলাদেশের অন্যান্য তরুণ শিক্ষার্থীদেরও দেশের সীমানার বাইরে বড় স্বপ্ন দেখতে অনুপ্রাণিত করুক। তাঁর বিশ্বাস, বিদেশে পড়াশোনা করা কোনো অসম্ভব স্বপ্ন নয়। দৃঢ়তা, পরিশ্রম এবং অধ্যবসায় থাকলে এমন অনেক সুযোগ অর্জন করা সম্ভব, যা প্রথমে হয়তো অনেক দূরের মনে হয়।
“আমি চাই আমার যাত্রা বাংলাদেশের অন্যান্য শিক্ষার্থীদের দেখাক যে তারা আরও বড় স্বপ্ন দেখতে পারে। আমার অভিজ্ঞতা যদি অন্তত একজন শিক্ষার্থীকে বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য চেষ্টা করতে এবং নিজের সক্ষমতার ওপর বিশ্বাস রাখতে অনুপ্রাণিত করে, তাহলে সেটিই হবে আমার জন্য সবচেয়ে অর্থবহ অর্জনগুলোর একটি।”
তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও ব্যক্তিগত সাফল্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিস্তৃত। মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করার পর চীনে অর্জিত জ্ঞান, গবেষণার অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত উন্নয়নে অবদান রাখতে চান তিনি। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বন্ধুত্ব, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে চান।
ঐন্দ্রিলার কাছে ইয়ানশান ইউনিভার্সিটি এখন আর শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়। এটি এমন একটি স্থান, যেখানে তাঁর একাডেমিক আকাঙ্ক্ষা, সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা এবং ব্যক্তিগত স্বপ্ন একসঙ্গে মিলিত হয়েছে।
বাংলাদেশ থেকে চীন—অয়ন্দ্রিলার এই যাত্রা আন্তর্জাতিক শিক্ষার বৃহত্তর উদ্দেশ্যকেই তুলে ধরে: সীমান্ত পেরিয়ে জ্ঞান অর্জন, ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা এবং অর্জিত জ্ঞানকে এমনভাবে কাজে লাগানো, যা ভবিষ্যতে সমাজ ও দেশের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। ইয়ানশানে তাঁর প্রথম বছরটি হয়তো একটি দীর্ঘ যাত্রার মাত্র শুরু, কিন্তু এই এক বছরই তাঁকে দিয়েছে নতুন আত্মবিশ্বাস, নতুন স্বপ্ন এবং নতুন লক্ষ্য।
তিনি এসেছিলেন বাংলাদেশ থেকে একজন শিক্ষার্থী হিসেবে; আজ তিনি নিজেকে দেখছেন একজন ভবিষ্যৎ গবেষক, প্রযুক্তিবিদ এবং অনুপ্রেরণাদায়ী মানুষ হিসেবে। তাঁর স্বপ্ন এখন শুধু নিজের পথ তৈরি করা নয়—বরং এমন একটি পথ তৈরি করা, যে পথে হেঁটে বাংলাদেশের আরও অনেক শিক্ষার্থী নিজেদের স্বপ্নের সীমানা আরও দূর পর্যন্ত বিস্তৃত করতে সাহস পাবে।