কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা নিভৃতে আলো জ্বালান। যাঁদের জীবন কেটে যায় অন্যের ভবিষ্যৎ গড়ার সংগ্রামে। অথচ নিজের প্রচার তাঁরা কখনোই চান না। কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের খোন্দকারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক মরহুম শফিকুর রহমান ছিলেন তেমনই একজন নির্লোভ, আদর্শবান ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষাগুরু। শিক্ষা বিস্তারে তাঁর অবদান একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আজীবন আলোকিত মানুষ গড়ে তোলাই ছিল তাঁর জীবনের ব্রত।
বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার শুরুর দিনগুলো ছিল নানা সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতায় ভরা। অবকাঠামোগত সংকট, সীমিত সুযোগ-সুবিধা এবং সামাজিক প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করেই তিনি শিশুদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন শিক্ষার আলো।
সততা, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধের মাধ্যমে তিনি খোন্দকারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে অল্প সময়েই একটি আদর্শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রূপ দেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, “শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড” আর নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ ছাড়া শিক্ষা কখনো পূর্ণতা পায় না।
পাঠ্যপুস্তকের গণ্ডির বাইরে গিয়ে শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম ও মানবিক গুণাবলি বিকাশে তিনি ছিলেন সদা সচেতন। তাঁর কঠোর শাসনের আড়ালে লুকিয়ে থাকত গভীর স্নেহ ও পিতৃতুল্য মমতা। তাঁর হাতে গড়া অসংখ্য শিক্ষার্থী আজ সমাজের বিভিন্ন স্তরে প্রতিষ্ঠিত হয়ে তাঁর আদর্শের বাস্তব প্রতিফলন ঘটাচ্ছেন।
প্রয়াত শফিকুর রহমানের কর্মজীবনের সাফল্য ও নিষ্ঠার কথা স্মরণ করে তৎকালীন চকরিয়া উপজেলার সাবেক প্রাথমিক সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা ও বর্তমান প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মহিউদ্দিন মো. আলমগীর বলেন, আমার দীর্ঘ চাকরি জীবনে হাতে গোনা যে কয়েকজন প্রধান শিক্ষককে সত্যিকার অর্থে আদর্শবান ও নিবেদিতপ্রাণ হিসেবে পেয়েছি, প্রয়াত শফিকুর রহমান তাঁদের মধ্যে অন্যতম। ছাত্রছাত্রী ও খোন্দকারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতি তাঁর আন্তরিকতায় কখনো ঘাটতি ছিল না। তাঁর দায়িত্বকালেই ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের মধ্যে মেধাবৃত্তি পরীক্ষায় খোন্দকারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নিয়মিতভাবে প্রথম স্থানে অবস্থান করতো। যা তাঁর দক্ষ নেতৃত্ব, কঠোর পরিশ্রম ও নিষ্ঠারই উজ্জ্বল প্রমাণ।
গত ৩১ ডিসেম্বর (বুধবার) খোন্দকারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোরশেদুল আলমের বিদায় উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য ও আবেগঘন অনুষ্ঠানে এই মহান শিক্ষাগুরুকে মরণোত্তর সম্মাননা প্রদান করা হয়। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁর আজীবন ত্যাগ, নিষ্ঠা ও শিক্ষা বিস্তারে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এ সম্মাননা প্রদান করে।
সম্মাননা স্মারকটি গ্রহণ করেন মরহুম শফিকুর রহমানের বড় ছেলে, চকরিয়া সিটি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হেফাজতুর রহমান। পিতার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, শিক্ষাই ছিল বাবার জীবনের সবচেয়ে বড় সাধনা। তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন শিক্ষার্থীকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারলেই জীবনের প্রকৃত সার্থকতা অর্জিত হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক, সহকর্মী ও অতিথিরা স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগ সংবরণ করতে পারেননি। কারও চোখে অশ্রু, কারও কণ্ঠে কৃতজ্ঞতার ভার।
অনেকেই বলেন, আজ তিনি শারীরিকভাবে আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ, কর্ম ও শিক্ষার আলো আজও খোন্দকারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষার্থীর হৃদয়ে দীপ্তিমান হয়ে রয়েছে।
অনুষ্ঠান শেষে এলাকাবাসী, সহকর্মী ও তাঁর অসংখ্য প্রাক্তন শিক্ষার্থী গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে মরহুম শফিকুর রহমানের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া করেন, তিনি যেন এই মহান শিক্ষাগুরুকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন।
মরহুম শফিকুর রহমান চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবেন, একজন প্রকৃত শিক্ষাগুরু, নিঃস্বার্থ মানুষ এবং আলোকিত মানুষ গড়ার নীরব কারিগর হিসেবে।