আসছে বর্তমান সরকারের নতুন বাজেট। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে বিভিন্ন পণ্যের ওপর কর ও শুল্ক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব আসতে পারে। এর ফলে কিছু বিলাসী ও আমদানি নির্ভর পণ্যের দাম বাড়লেও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য, চিকিৎসাসামগ্রী, মোবাইল ফোন, বিদ্যুৎ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের বিভিন্ন পণ্যের দাম কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
আগামী বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করবেন। প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বাজেটে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা এবং সম্ভাব্য বাজেট ঘাটতি হতে পারে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।
বাজেটে যেসব পণ্যের দাম বাড়তে পারে
আসন্ন বাজেটে সিগারেট ও নিকোটিনজাত পণ্যের ওপর নতুন করে উচ্চ হারে সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব রয়েছে। এর ফলে উচ্চস্তরের ১০ শলাকার সিগারেটের প্যাকেটের দাম ১৮৫ টাকা থেকে বেড়ে ২১০ টাকা হতে পারে। একই সঙ্গে নিকোটিন পাউচ ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের দামও বাড়তে পারে।
দেশে উৎপাদিত অ্যালকোহলের ওপর লিটারপ্রতি ৫০০ টাকা ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব থাকায় এ পণ্যের মূল্যও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নির্মাণ খাতের অন্যতম প্রধান উপকরণ রডের ওপর কর ও ভ্যাট প্রায় ১০ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা থাকায় বাজারে রডের দাম বাড়তে পারে। এর প্রভাব নির্মাণ ব্যয়ের ওপরও পড়তে পারে।
উচ্চমূল্যের হিমায়িত মাছ এবং আমদানিকৃত কাজুবাদামের ওপর শুল্ক ও ভ্যাট বৃদ্ধির প্রস্তাব থাকায় এসব পণ্যের বাজারদরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে কাজুবাদামের আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশ করার আলোচনা রয়েছে।
এ ছাড়া বিদেশি প্রসাধনী, বিলাসবহুল পণ্য এবং উচ্চমূল্যের আমদানিকৃত খাদ্যপণ্যের ওপর ২০ শতাংশ পর্যন্ত ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব থাকায় এসব পণ্যের দাম বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
যেসব পণ্যের দাম কমতে পারে
বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে চাল, ধান, গম, ভোজ্যতেলসহ প্রায় ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য ও কৃষিপণ্যের ওপর উৎসে কর কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি এসব পণ্যের ওপর বিদ্যমান রেগুলেটরি ডিউটি প্রত্যাহারের প্রস্তাবও আসতে পারে।
দেশীয় তৈলবীজ ব্যবহার করে ভোজ্যতেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি কর অব্যাহতির সুবিধা দেওয়া হলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সরিষার তেলসহ বিভিন্ন ভোজ্যতেলের দাম ভবিষ্যতে আরও সাশ্রয়ী হতে পারে।
চিকিৎসা খাতে কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার, ওষুধ উৎপাদনের কাঁচামাল, ক্যান্সারের ওষুধ, হার্টের রিং ও চোখের লেন্স আমদানিতে কর ও ভ্যাট কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। এতে চিকিৎসা ব্যয় কিছুটা কমতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
মোবাইল, বিদ্যুৎ ও প্রযুক্তি খাতে স্বস্তি
মোবাইল ফোন উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামালের ওপর উৎসে কর কমানোর পাশাপাশি সিমের ওপর বিদ্যমান ৩০০ টাকার কর বাতিলের প্রস্তাব রয়েছে। ফলে নতুন সিম কেনা এবং মোবাইল ফোনের উৎপাদন ব্যয় কমতে পারে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সৌরবিদ্যুৎ খাতে কর ছাড় অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ যন্ত্রপাতি আমদানিতেও কর অব্যাহতির সুবিধা বাড়ানো হতে পারে, যা নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে উৎসাহ জোগাবে।
ইলেকট্রিক গাড়ি, বাস ও ট্রাক আমদানিতে উৎসে কর শূন্য শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব থাকায় পরিবেশবান্ধব যানবাহনের বাজারও সম্প্রসারিত হতে পারে।
স্বর্ণে কর ছাড়
স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকারের ওপর উৎসে কর উল্লেখযোগ্য হারে কমানোর প্রস্তাব রয়েছে। এর ফলে স্বর্ণের বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
প্রযুক্তিপণ্যে কর ছাড়
এ ছাড়া কম্পিউটার প্রিন্টার, মনিটর, ফ্ল্যাশ মেমোরি এবং অন্যান্য প্রযুক্তিপণ্য আমদানিতে আগাম কর কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে প্রযুক্তিপণ্যের দাম কিছুটা কমতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন বাজেটে একদিকে বিলাসী ও স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ পণ্যের ওপর কর বাড়ানো হবে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও উৎপাদন খাতে কর ছাড় দেওয়া হবে। ফলে বাজেটের প্রভাব সরাসরি ভোক্তা বাজারে প্রতিফলিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।