
মো. কামাল উদ্দিন, নিজস্ব প্রতিবেদক:
চকরিয়া উপজেলার হারবাং ইউনিয়নের উত্তর হারবাং এলাকায় ছড়াখালে ফের শ্যালোমেশিন বসিয়ে অবৈধভাবে বালি উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনের একাধিক অভিযান ও সতর্কতা সত্ত্বেও একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে নির্বিঘ্নে এ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, উত্তর হারবাংয়ের ইছাছড়ি, ভাণ্ডারির ডেবা, কোরবানিয়া ঘোনা ও আশপাশের ছড়াখাল এলাকায় শক্তিশালী শ্যালোমেশিন ও ড্রেজার ব্যবহার করে বালি উত্তোলন করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও ছড়াখালের তলদেশ অস্বাভাবিকভাবে গভীর করে ফেলা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ৫০-৬০ ফুট প্রশস্ত প্রাকৃতিক ছড়াখাল এখন কোনো কোনো স্থানে ২০০ ফুট পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ছড়ার দুই তীর কেটে ও ফসলি জমি ধ্বংস করে অব্যাহত বালি উত্তোলনের কারণে শত শত একর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক কৃষক জীবিকা হারানোর শঙ্কায় পড়েছেন। পাশাপাশি বসতবাড়িগুলোও মারাত্মক ভাঙন-ঝুঁকিতে রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ওই এলাকায় একটি সংঘবদ্ধ বালু সিন্ডিকেট- মোর্শেদ আলম মানিক, মো. এমরান ও মাওলানা শহিদুল ইসলামসহ কয়েকজনের নেতৃত্বে ২৪ ঘণ্টা শ্যালোমেশিন চালিয়ে বালি উত্তোলন ও ট্রাকযোগে বিভিন্ন এলাকায় পাচার করছে। এতে গ্রামীণ সড়কগুলো দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং ধুলাবালির কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে উঠছে।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, এই অবৈধ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে। অনেকেই মারধর ও এলাকা ছাড়ার ভয় থাকায় প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।
সম্প্রতি বালি উত্তোলনের দৃশ্য ধারণ করতে গিয়ে তিন সাংবাদিকের ওপর হামলার অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয় এক বালু ব্যবসায়ীর নেতৃত্বে তাদের মারধর করা হয় এবং পানিতে ডুবিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে বলে ভুক্তভোগীরা দাবি করেন।
আইন অনুযায়ী ছড়া ও খাল থেকে ভারী যন্ত্র ব্যবহার করে বালি উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবে বাস্তবে ইজারার শর্ত ভেঙে ছড়ার তলদেশ ও পাড় কেটে নির্বিচারে বালি উত্তোলন অব্যাহত রয়েছে।
স্থানীয় ভূমি অফিস সূত্র জানায়, নির্ধারিত সীমার বাইরে গিয়ে বালি উত্তোলন সম্পূর্ণ অবৈধ। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চকরিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুপায়ন দেব বলেন, ছড়াখালে অবৈধভাবে বালি উত্তোলনের বিষয়টি তাদের নজরে রয়েছে। গতকালও হারবাংয়ে অভিযান করা হয়েছে। পুনরায় কেউ যদি বালি তুলে থাকে তাহলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, পরিবেশ ও সরকারি সম্পদ রক্ষায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।
এদিকে প্রশাসন মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে ড্রেজার ও ডাম্পার জব্দ করলেও কার্যকর স্থায়ী সমাধান আসছে না। অভিযানের কিছুদিন পরই আবারও একইভাবে বালি উত্তোলন শুরু হয়ে যাচ্ছে।
পরিবেশবিদরা বলছেন, ছড়াখালের তলদেশ এভাবে গভীর ও প্রশস্ত হতে থাকলে বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢলে ভয়াবহ বন্যা ও ব্যাপক ভাঙনের ঝুঁকি বাড়বে। একই সঙ্গে জীববৈচিত্র্য ও আশপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
স্থানীয়দের দাবি, বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, চিহ্নিত সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে স্থায়ী ও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা না নিলে হারবাংয়ের ছড়াখালগুলো পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে পড়বে। তারা প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।